
প্রতিবেদক | ঢাকা
১৩ মে, ২০২৬
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশ যখন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায়, তখন আইসিটি বিভাগ ও বেসিস (BASIS)-এ ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী দোসরদের পুনর্বাসনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট এবং বিতর্কিত নির্বাচনের কুশীলব হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা বর্তমানে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলোতে যুক্ত হচ্ছেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারের সুরক্ষা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
ফ্যাসিবাদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ এখন প্রধানমন্ত্রীর পাশে
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রাইডসিস আইটি (Pridesys IT)-এর কর্ণধার মনোয়ার ইকবাল বিগত সরকারের আমলে ১৭ বছর ধরে দাপটের সাথে কাজ করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন সিআরআই (CRI)-এর অন্যতম কুশীলব এবং বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনাকারী টিমের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার ব্যক্তিগত অফিস থেকেই সিআরআই-এর অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আইসিটি খাতের যোগ্য ও ত্যাগী পেশাদারদের উপেক্ষা করে মনোয়ার ইকবালের প্রতিষ্ঠানকে ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে তাকে প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি ক্রয়নীতি উপেক্ষা করে এবং টেন্ডার ছাড়াই এই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে কার ইশারায় কাজ দেওয়া হলো?
বেসিস ও আইসিটি বিভাগে সিন্ডিকেটের থাবা
বেসিস-এর বর্তমান অ্যাসোসিয়েট কমিটিতেও (এপ্রিল ২০২৬) আধিপত্য বজায় রেখেছে ফ্যাসিবাদের দোসররা। মনোয়ার ইকবালের সাথে এই কমিটিতে রয়েছেন জেমস ও ফেরদৌস ইপন। জেমসের প্রতিষ্ঠান ‘সিনার্জি ইন্টারফেস লিমিটেড’ সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলত বলে জানা গেছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এই গোষ্ঠীটি বিতর্কিত ব্যবসায়ী ডিউক ও মুশফিকের সাথে এখনো একই মঞ্চ ভাগ করে নিচ্ছেন। গত ৩ মে এনবিআর (NBR) চেয়ারম্যানের সাথে ফেরদৌস ইপনের বৈঠকের বিষয়টিও অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। এনবিআরের পিডি’র স্ত্রী ফারহানার সাথেও এই চক্রের গোপন যোগসূত্র থাকার অভিযোগ উঠেছে।
সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিতে ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের’ সহযোগীরা
আইসিটি বিভাগে কামরুজ্জামান নামক এক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী পলকের আমলে দুই বছর সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সিতে কর্মরত থাকাকালে তিনি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (DSA) বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি কুখ্যাত জিয়াউল আহসানের সাথে আইসিটি টাওয়ারে গোপন বৈঠক করেছিলেন, যেখানে ফেসবুক পোস্ট ট্র্যাক করে গ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট শাটডাউনের পরিকল্পনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইসিটি সচিব বা উপদেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে এই কর্মকর্তা সেনানিবাসে গোপন বৈঠক করে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে অনিয়মের কারণে তাকে বদলি করা হলেও প্রশাসনিক তদবিরের জোরে তিনি পুনরায় আইসিটি বিভাগে ফিরে আসেন এবং পুরোনো সিন্ডিকেট পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
মন্ত্রীদের ঘিরে ‘ফ্লোরা টেলিকম’ ও ডিউক সিন্ডিকেট
সজীব ওয়াজেদ জয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পাসপোর্ট প্রকল্পের সুবিধাভোগী ফ্লোরা টেলিকমের মুস্তফা রফিকুল ইসলাম ডিউক বর্তমানেও সক্রিয়। তার সংগঠন ‘বিসা’ আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে আইসিটি উপদেষ্টা ফকির মাহবুব আনাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খানকে দেখা গেছে। যদিও সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসাদুকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি উপস্থিত হননি।
বিশেষজ্ঞ ও তৃণমূলের ক্ষোভ
আইসিটি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৭ বছর যারা ফ্যাসিবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে, তারা আজ কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে? বিএনপির অভ্যন্তরে যোগ্য আইসিটি বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও কেন এই ‘লুকোচুরি’ খেলা চলছে?
তাদের মতে, এই ফ্যাসিস্ট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকা মানেই হলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং সাইবার সার্বভৌমত্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়া। কারা এই ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে এবং কেন প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বিনা টেন্ডারে কাজ দেওয়া হচ্ছে—তা নিয়ে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।








