মতামত | ঢাকা
পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়—কোনটি শ্রেষ্ঠ, তা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা তর্ক-বিতর্ক করে কোনো লাভ নেই। এই অনর্থক ঝগড়ায় মেতে না থেকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত আসল সংকটের গোড়ায়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি মাত্র তিনটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি—আগামী মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এগুলো এশিয়ার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
আমার এই দাবি কোনো আবেগ বা মনগড়া কথা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা প্রশাসন (Higher Education Administration) কীভাবে পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে দেশটির একটি শীর্ষস্থানীয় 'R1' (Highest Research Activity) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ডক্টরেট ডিগ্রি রয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বৃহৎ এবং স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি সিস্টেম (যেমন: University of Texas System)-এ দীর্ঘ বছর কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি এই তিনটি সংস্কারের প্রস্তাব করছি:
১. শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছ নীতি ও মেধার মূল্যায়ন
শিক্ষক হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। তাই শিক্ষক নিয়োগে একটি সুস্পষ্ট, আধুনিক ও স্বচ্ছ নীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। শুধুমাত্র সনাতন একাডেমিক ফলাফলের (সিজিপিএ) ওপর নির্ভর করে শিক্ষক নির্বাচন করার দিন শেষ। প্রার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা বিবেচনায় এনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সাজাতে হবে। একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে মূলত পাঁচটি গুণ থাকা জরুরি:
চমৎকার একাডেমিক রেকর্ড।
কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skills)।
আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি (Pedagogy)।
উচ্চ নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব।
মানসম্মত গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা।
২. দলীয় লেজুড়বৃত্তি মুক্ত শক্তিশালী কমিটি গঠন
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটি, উপকমিটি এবং সিনেটের মতো নীতিনির্ধারণী পর্ষদগুলোতে কেবলই যোগ্য ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এখানে লাল, নীল, সাদা বা হলুদ—কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয় বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। দলীয় লেজুড়বৃত্তি বাদ দিয়ে খাঁটি শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিলেই কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও মান রক্ষা সম্ভব।
৩. নিয়মিত শিক্ষক ও কোর্স মূল্যায়ন (Accountability)
উচ্চশিক্ষার মান ধরে রাখতে জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত শিক্ষক এবং কোর্স মূল্যায়ন (Course and Faculty Evaluation) পদ্ধতি চালু করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতি বছর কোর্স কারিকুলাম পর্যালোচনা, সংশোধন ও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকা শিক্ষকদের তিরস্কার না করে, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পেশাগত উন্নয়ন (Professional Development) ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা:
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অংশ। সদিচ্ছা থাকলে এবং এই তিনটি মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে মেধা ও সম্ভাবনা রয়েছে, তা দিয়ে আগামী পাঁচ বছরেই এশিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব। প্রশাসন কি এই পরিবর্তনের সহসী পদক্ষেপ নেবে?
লেখক : ডঃ . মোহাম্মদ রেজা
সহকারি অধ্যাপক
জর্জিয়া সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউএসএ ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ মাহবুব উদ্দিন
মিরপুর , ঢাকা - ১২১৬
Contact us: edit@timelinenews24.com
Office: ০১৮৪০৩১৫৫৫৫
Copyright © 2026 Timeline News24. All rights reserved.